বুধবার, ১১ মার্চ ২০২৬, ০৩:৪৫ অপরাহ্ন
ইসলামি ডেস্ক, অনলাইন সংস্করণ ॥
রমজান মুমিনের জন্য কেবল উপবাসের নাম নয়, বরং এটি পরম করুণাময় আল্লাহর প্রতি আনুগত্য ও পূর্ণ আত্মসমর্পণের মাস। অনেক ক্ষেত্রে আমরা রমজানকে কেবল বাহ্যিক কিছু নিয়ম-কানুন ও ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলি। ফলে রমজানের প্রকৃত সুফল থেকে আমরা বঞ্চিত হই। রমজানকে ফলপ্রসূ করতে হলে একে নিজের মন ও মস্তিষ্কে স্থান দিতে হবে। বাহ্যিক ইবাদতের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণভাবে আল্লাহর কাছে নিজেকে সঁপে দেওয়া এবং ইবাদতে পূর্ণ একাগ্রতা বজায় রাখা অপরিহার্য।
কেননা, মানুষের মন ও দেহই হলো তার সব কর্মের পরিচালক। আল্লাহর দরবারে বাহ্যিক আড়ম্বরের চেয়ে অন্তরের বিশুদ্ধতা ও একাগ্রতা বেশি মূল্যবান। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের বাহ্যিক চাল-চলন ও বিত্তবৈভবের প্রতি দৃষ্টিপাত করেন না; বরং তিনি দৃষ্টি দিয়ে থাকেন তোমাদের অন্তর ও আমলের প্রতি।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৬৪)
হৃদয় দিয়ে ইবাদতের গুরুত্ব
ইসলাম মানুষকে ইবাদতের সময় তার সর্বস্ব আল্লাহর সামনে সমর্পণ করার নির্দেশ দিয়েছে। অর্থাৎ মুমিন তার ইবাদত পরিচালনা করবে হৃদয়, আত্মা, জ্ঞান, চিন্তা এবং শারীরিক ও চারিত্রিক শিষ্টাচারের সমন্বয়ে। এটি কোনোভাবেই কাম্য নয় যে, শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ইবাদতে রত থাকবে অথচ মন ও মস্তিষ্ক থাকবে আল্লাহ থেকে বিমুখ। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, “তারা তো আদিষ্ট হয়েছিল আল্লাহর আনুগত্যে বিশুদ্ধচিত্ত হয়ে একনিষ্ঠভাবে তাঁর ইবাদত করতে এবং নামাজ কায়েম করতে ও জাকাত দিতে, এটাই সঠিক দ্বিন।” (সুরা: বাইয়িনা, আয়াত: ৫)
অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন, “আমার নামাজ, আমার ইবাদত, আমার জীবন ও আমার মরণ জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহরই উদ্দেশ্যে।” (সুরা: আনআম, আয়াত: ১৬২)
আল্লাহর দরবারে আত্মসমর্পণের ৫ উপায়
রমজানকে অর্থবহ করতে এবং নিজেকে পুরোপুরি আল্লাহর দরবারে সঁপে দিতে পাঁচটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন:
১. আত্মসংশোধন: রমজান হলো নিজেকে শুধরে নেওয়ার শ্রেষ্ঠ সময়। মুমিন তার অতীত পাপের জন্য তওবা করবে এবং ভবিষ্যতে গুনাহ না করার অঙ্গীকার নিয়ে নেক আমলে আত্মনিয়োগ করবে। কোরআনের ভাষায়, যারা কোনো ভুল করলে আল্লাহকে স্মরণ করে ক্ষমা চায় এবং জেনেশুনে পাপের পুনরাবৃত্তি করে না, আল্লাহ তাদের ক্ষমা করে দেন। (সুরা: আলে ইমরান, আয়াত: ১৩৫)
২. নতুন জীবনের প্রত্যয়: এই মাসেই পবিত্র কোরআন নাজিল হয়েছে, যা মানবজাতির জন্য হেদায়েতের আলোকবর্তিকা। রমজানে আত্মশুদ্ধি ও চারিত্রিক সৌন্দর্যের মাধ্যমে নতুন জীবনের শপথ নিতে হবে। সাহাবী জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) বলেছেন, “যখন তুমি রোজা রাখো, তখন যেন তোমার কান, চোখ ও জিহ্বাও মিথ্যা ও পাপাচার থেকে রোজা রাখে।”
৩. ঐশী জ্ঞান বা কোরআন চর্চা: কোরআন নাজিলের মূল উদ্দেশ্য হলো এর আয়াতগুলো নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা এবং সেই অনুযায়ী জীবন গড়া। রমজানে কোরআন তিলাওয়াতের পাশাপাশি এর মর্মার্থ অনুধাবন করা মুমিনের কর্তব্য। (সুরা: সোয়াদ, আয়াত: ২৯)
৪. উত্তম গুণে গুণান্বিত হওয়া: আত্মসংযমের মাধ্যমে চারিত্রিক উৎকর্ষ অর্জনই রোজার শিক্ষা। রাসূল (সা.) সতর্ক করে বলেছেন, যে ব্যক্তি মিথ্যা ও মন্দ কাজ ত্যাগ করতে পারল না, তার উপবাস থাকাতে আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৯০৩)
৫. আমলের ধারাবাহিকতা: রমজান হলো এক মাসের নিবিড় প্রশিক্ষণ। এই প্রশিক্ষণের সফলতা নির্ভর করে রমজান পরবর্তী সময়ে আমলের ধারাবাহিকতা রক্ষার ওপর। হযরত আয়েশা (রা.) বর্ণিত হাদিস অনুযায়ী, আল্লাহ সেই আমলকেই বেশি ভালোবাসেন যা নিয়মিত করা হয়, যদিও তা পরিমাণে অল্প হয়। (সুনানে আবি দাউদ, হাদিস: ১৩৬৮)
পরিশেষে, রমজানের এই পবিত্র দিনগুলোতে আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাঁর নির্দেশিত পথে পূর্ণ আত্মসমর্পণের তাওফিক দান করুন। আমিন।